করোনাকালে আমাদের কত না বিয়োগব্যথা সহ্য করতে হল

করোনাকালে আমাদের কত না বিয়োগব্যথা সহ্য করতে হল
সম্পাদকীয়-- সময় কারো জন্য থেমে থাকে না l দেখতে দেখতে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে চলেছে আমাদের স্বরধ্বনি কবিতা পত্রিকা। হ্যাঁ এবার এটি ত্রৈমাসিক নয়, দ্বিমাসিক পত্রিকা l কত সুখ দুঃখের পথ পেরিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হয়-- উত্থান-পতনের দৃশ্য দেখে দেখে আমরা এগিয়ে চলি I করোনাকালে আমাদের কত না বিয়োগব্যথা সহ্য করতে হল, কত না অমানবিক হৃদয়বিদারক ঘটনার সম্মুখীন হতে হল ! এ সব মহামারী অকাল দেখে দেখে আমাদের মন ভারী হয়ে থাকল I আমরা নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য কত কি না শিখলাম--মুখে মাস্ক আঁটা শিখলাম, হাতে গ্লোবস পড়া শিখলাম ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে একে অন্য থেকে ক্রমশ সরে যেতে শিখলাম। আমরা ঘরে বন্দি হয়ে থাকার অভিজ্ঞতা পেলাম। সমস্ত বাধার মধ্যেও জীবন ঠিক এগিয়ে চলে--আমরা নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে উঠি--প্রতিদিনের মত খাই পড়ি ঘুমাই। সময় কাটাতে বই পড়ি, খেলাধুলা করি, হোক সে খালা স্বামী স্ত্রী ও ছেলে মেয়েদের সঙ্গে, তবু আনন্দ কুড়িয়ে নিতে আমরা কখনও পিছু পা হই না l বাঁচার তাগিদে পরিবেশ-পরিস্থিতিকে যে মানিয়ে নিতে হবেই ! মনের তাগিদে আমরা স্বাচ্ছন্দ খুঁজে ফিরি l অলস দুপুরে কিংবা সময়ের ফুরসতে আমরা মনের সঙ্গে কথা বলি, স্মৃতিচারণ করি, সাহিত্য চর্চা করি, বই পড়ি, অনলাইন পত্রিকা, ব্লগ, ই-বুক পড়ি, পড়ি উপন্যাস, গল্প, কবিতা l কবিতা মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বললে ভুল হবে না l কবিতা স্মৃতি রোমন্থনের ভাষ্য l কবিতা জীবন বলয় l বস্তুত প্রত্যেক মানুষের মনেই কবি কবি ভাব আছে--ঋতুভেদের মতই তাড়িত হয়ে মানুষ মনে মনে কবিতার সৃজন করে--ভাবনার মাঝে সে কবিতার রংতুলি খুঁজে ফেরে l প্রেম কিন্তু কবিতা ছাড়া জমে না--কোথাও তো কাব্য ছন্দের মধ্যে ভালোবাসা লুকিয়ে আছে l ভালো মন্দ সুখ দুঃখ দৈনতার মাঝ থেকে অনায়াসে কবিতার ভাব মথিত হতেই পারে l পোড়াজীবনের মাঝ থেকে আগুনকবিতা বেরিয়ে আসতে পারে l এক কথায়, কবিতা জীবনের কোথায় নেই ? সর্বত্র সে বিরাজমান। ভাব-ভাবনা সঠিক শব্দ-ভাষ্য জুড়ে গেলে প্রকৃতিও কবিতা লেখে l হিল্লোলায়িত বাতাস, পাখির কলকাকলি, এক টুকরো সকাল রোদ, গোধূলির লালাভে ক্রমশ, ক্রমশ কবিতা সৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে ! যাই হোক, এ ভাবেই কিছু ভাবনা ভাষায় মিশে, কলমের আঁচড়ে, কিংবা আঙুলের স্পর্শে অথবা আন্তর্জাল আবহওয়ায় সৃষ্ট কিছু কবিতা আমরা ধরে রেখেছি আমাদের দ্বিমাসিক স্বরধ্বনি পত্রিকায় l সমস্ত বন্ধু-পাঠকদের কাছে আমাদের একান্ত অনুরোধ, আমাদের পত্রিকা পড়ুন, ভালো মন্দের বিচারে আপনাদের উৎসাহ, দিকদর্শন আমাদের ভবিষ্যৎ তৈরি করুক --এমনি আশা রেখে আমাদের বর্তমান সম্পাদকীয় কথন এখনকার মত শেষ করছি l ধন্যবাদান্তে- সম্পাদক তাপসকিরণ রায় l সহ-সম্পাদক--শমিত কর্মকার ও সাবিত্রী দাস l

Friday, December 4, 2020

বিকাশ ভট্টাচার্যের গুচ্ছ কবিতা

 



বিকাশ ভট্টাচার্যের  গুচ্ছ কবিতা

___________________________

 

১. গর্ভলজ্জা 

 

কোথা থেকে আসছে কাতরকণ্ঠ 

শব্দনাভি এমন সকরুণ 

খুঁজতে খুঁজতে বিশাল একটা মাঠ 

পাঁচিলঘেরা। দুপুরে নিজঝুম 

 

মাঠের কোণে একটা পোড়োঘর 

দরজা জানলা ভাঙা। পাল্লাহীন 

ঘরের ভেতর কচিপাতাটির মতো 

একটি শরীর ফ্যাকাসে সংজ্ঞাহীন 

 

যৌনবিকার! হায় রে গর্ভলজ্জা 

ভ্রষ্টপুরুষ। তোর হোক শরশয্যা 

                   _______

 

২. পটিয়সী 

 

কী সুন্দর কথা বলো

কী নিখুঁত। নিক্তি দিয়ে মাপা

কী দারুণ অগ্নিহোত্রী রূপ তোমার 

কী বিনয়ী। কী শিক্ষানবিসিপনা

 

প্রেমের ফল্গু তবু বয়ে যায় 

হৃদয়ের একূল ওকূল শূন্য বালুচর 

ঘরের ভেতরে এক আবছায়া ঘর 

 

অথচ কী রেওয়াজী কণ্ঠ তোমার 

কী জলোর্মি খেলে যায় দৃষ্টি সরোবরে

যে-বিষাদ ঝরে পড়ে হলুদ পাতার মতো 

কিংবা ভাসানের ফুলে

কী দারুণ দক্ষতায় জল ছেঁকে তুলে রাখো 

বারোয়ারি জঞ্জালে 

                    _____________

 

কবিতা  ২. অলখলিপি

 

দু'চোখের জমাট মেঘ থেকে 

শান্তিবারি অফুরান ঝরে

 

কপাল ফুঁড়ে গেছে তীক্ষ্ম গজাল

বিষযন্ত্রণা 

 

জীবন লটকে আছে কাটাঘুড়ির মতন 

ক্রুশকাঠে

মগডালে মগডালে

সিলিং-এ

পৃথিবীর মাটিতে আজও তাই 

                 অনাবিষ্কৃত রক্তপুরাণ

 

রক্ত কি ঝরে না কোনো রঙিন আলোর

করুণ পাড়ায় !                             

এবং যখন গুমরে মরো ভালোবাসায়____

'ভালোবাসি' এই কথাটাই 

লিখতে থাকো অগোচরে                          

                            অকাতরে 

                                  চোখের পাতায় 

                         __________

 

কবিতা  ৩. স্কুলবাড়ি 

 

ওই তো স্কুলবাড়ি। দেয়াল বেয়ে উঠেছে রোদ্দুর 

ওই তো সোনামুখ। কাননে কুসুমকলি ফুটলো 

ওই তো এলানো ছায়া ভিজে ঘাসে শয্যার দাগ

এই তো আমিও একা অধোমুখে বসেছি পাশে 

 

তুমি কি দেখনি কিছু দিনে রাতে ওঠাপড়াও

মুঠোমুঠো বিশ্বাস পলিপ্যাকে ফেলে কারা রাখে?

অগণন মৃতভ্রূণ। ওরই মাঝে খেলে পথশিশু

শৈশব আমারও ছিল।'নবজাতক' আমারও পড়া

 

ভেঙেছে বার্লিনের দেয়াল।নড়েছে চিনের প্রাচীর

ধসেছে মিথের সৌধ।বাঁধ ভেঙে ছুটেছে নদী 

নিজের মোড়ক খুলে দ্যাখো কতটা ধুলোমলিন

বাঁধাফ্রেমে আটকে পড়া শৈশব কুসুমকালিন

                  ____________

 

কবিতা  ৫. স্বেচ্ছামৃত্যু

 

তোমার কেশবিন্যাসের কয়েকটা আলোফুল

ঝরে পড়েছিল। এবং সেটা দেখে 

নিশিগন্ধা বনের কথা মনে পড়ে যায়। অথচ 

সেদিন কারও একবারও চোখে পড়েনি 

অন্ধকারে কয়েকটা জোনাকির অপমৃত্যু 

 

নিরালোক বুকের ভেতরে তখন বন্দিশিবির

চোখের পর্দা যেন বিচ্ছিরিরকম পুড়ে গেছে 

স্মৃতিরা হাতড়ে চলে ভ্যাপসা গন্ধেভরা 

                     কালোয়াতি গুদামের ভেতর 

কয়েকটা আলোপোকাই তখন খুলে দিয়েছিল

স্বেচ্ছামৃত্যুর টানে স্বপ্নসদর

 

একবিন্দু দীপালোক জ্বেলে

জোনাকিরা খ'সে পড়েছিল বিমূর্ত আঁধারে

              ___________

 

কবিতা  ৪. স্কুলবাড়ি 

 

ওই তো স্কুলবাড়ি। দেয়াল বেয়ে উঠেছে রোদ্দুর 

ওই তো সোনামুখ। কাননে কুসুমকলি ফুটলো 

ওই তো এলানো ছায়া ভিজে ঘাসে শয্যার দাগ

এই তো আমিও একা অধোমুখে বসেছি পাশে 

 

তুমি কি দেখনি কিছু দিনে রাতে ওঠাপড়াও

মুঠোমুঠো বিশ্বাস পলিপ্যাকে ফেলে কারা রাখে?

অগণন মৃতভ্রূণ। ওরই মাঝে খেলে পথশিশু

শৈশব আমারও ছিল।'নবজাতক' আমারও পড়া

 

ভেঙেছে বার্লিনের দেয়াল।নড়েছে চিনের প্রাচীর

ধসেছে মিথের সৌধ।বাঁধ ভেঙে ছুটেছে নদী 

নিজের মোড়ক খুলে দ্যাখো কতটা ধুলোমলিন

বাঁধাফ্রেমে আটকে পড়া শৈশব কুসুমকালিন

                  ____________

 

কবিতা  ৩.  সবকিছুর পূর্বাভাস হয় না 

               ।। বিকাশ ভট্টাচার্য 

 

বুকের ভেতরে একটা অন্তরঙ্গ ছবি 

যেটা পড়ে আছে যোজন যোজন দূরে 

একটা নিবিড়তম মুহূর্তের ফ্রেম থেকে 

এর বেশি এখন আর কিছু বোঝা যাবে না 

 

সবকিছুর পূর্বাভাস হয় না 

 

একটা দীর্ঘ ঝড়ের রাতে যেভাবে মেহগনি 

গাছের ডাল ভেঙে ভেঙে পড়ে 

শিস দিয়ে ওঠে অন্ধকার 

একটা ডবল বেড খাটও যেভাবে 

প্রশস্ত হয় সন্নিবিষ্ট ঘুমে

এইসব ছিন্নভিন্ন অসহায় চিত্রগুলোই তো

স্তব্ধ ভোরের মতো গোঙাবে

এর চেয়ে বেশি কোনো প্রকৃতি প্রত্যয় 

ফ্রেম খুলে পাওয়া যাবে না 

             ____________ দোয়েল 

কুহুগানে মেতে ওঠা পাতাদের অডিও ক্যাসেট 

শুনতে শুনতে চলে গেছি                     

আবহমান পাখিদের স্রোতের দিকে

 

                    

গোপন হাতের খেলা অনেক দেখেছি বলে

মানুষের সান্নিধ্যে আমি গাছেদের

অলৌকিক গল্প করে যাই

 

 

গুচ্ছ কবিতা  ।।  বিকাশ ভট্টাচার্য 

 

কবিতা  ৫. নখদর্পণ

 

হাতের চেটোয় আঁকি সসাগরা পৃথিবী 

নখের ডগায় থাক প্যারিস লণ্ডন 

ফ্রেমবন্দি করে রাখি বাকিংহাম প্যালেস 

নৈশভোজ, ভ্যাটিকানের কান্নাপ্রহর 

প্যাণ্ডেমিক জনপদে স্বচ্ছ ভারতের

সংযমী শূন্য বসত। 

 

ঘোলা জলে মাছ ধরার অবিমিশ্র সুখ

হে ঈশ্বর। তাকিয়ে দেখুন 

            _________

No comments:

Post a Comment