সুকুমার চৌধুরীর কবিতাগুচ্ছ
প্রতিদিন
আমার কাছে বিশেষ কোন দিনের বিশেষ
মাহাত্ম্য নেই
প্রতিদিন জন্মদিন, প্রতিদিন উৎসবের দিন ।
অন্যরা সেটা মানবে কেন । তারা এক
একটা বিশেষ দিন
বিশেষ বিশেষ আবহে মুড়ে রাখতে চায় ।
রাত্তির দশটায় গাড়ি বের করি ।
বেরোতে হয় ।
আর আমাদের দীর্ঘ ড্রাইভে মস্ত
মস্ত মেনু ও ম্যাটার নেমে আসে ।
সময় এগিয়ে চলে । নির্বাচন শুধুই
পেছিয়ে পড়ে ।
আনন্দের ঠিকানা রাখে না কেউ । আর
আনন্দের খোঁজে
বিশেষ মুহূর্তগুলি উবে যায়
বাকবিতন্ডায়.....
রবিবাসরীয়
খুব যে চাঙ্গা লাগে তা নয়
ভোরবেলা ঘুম ভেঙ্গে গেলে
হয়তো ছুটির দিন, ক্লান্ত লাগে
শুয়ে শুয়ে নোঙরা দেওয়ালগুলি দেখি
কত ছবি ভেসে ওঠে, অস্পষ্ট আবহ
স্মৃতি ও অঙ্গার, নদী, মেঘ বনাঞ্চল
বিষণ্ণতা ছুঁয়ে যায়, একা লাগে, মীত
এবং আলস্য খুব মুড়ে থাকে রবিবাসরীয়
ত্যাগ
গাছে গাছে হাসির মতো
ফুটে উঠুক ফুল
মনে মনে বাগান কতো
রক্তে ভিজুক মূল ।
ফুলে ফুলে আনন্দ আর
বেঁচে থাকার গান
জনে জনে সুগন্ধী হার
তুলে দৃবার মান ।
খুশি টুশি বেড়াল পুষি
ঘুরে বেড়াক নীলে
আমি বুঝি সবার খুশি
এমনি ভাবেই মিলে ।
১৩ অগ্রহায়ণ ১৪১৭
ছিঃ
যার মুখ প্রতিদিন ফুটে ওঠে আয়নায়
অন্তত তাঁকে খুশি রাখা উচিত
মানুষের ।
অথচ যখনই মুখোমুখি হই নিজের
মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে : ছিঃ ।
এত দোষ আমার, এত ভুলচুক
এতশত দুর্বলতা । ছিঃ
এত লোভ আমার, এত পাপতাপ
ঈর্ষা আর রক্তমাংস । ছিঃ
নিজেকে খুশি করার বদলে
রোজ থুতু ছিটিয়ে আসি ।
যার মুখ প্রতিদিন ফুটে ওঠে আয়নায়
অন্তত তাঁকে খুশি রাখা উচিত
মানুষের ।
পারি কই ? ভণ্ড তো নই ।
তাই উচ্চারণ করি : ছিঃ
ফল্গু
ঝরে যাবো । যেন নির্ভার শিশির ।
এ রকম সাবলীল । বীতশব্দ, বিভা ।
গন্ধহীন, বর্ণহীন খুলে যাবো
নিবিড় ঘাসের বুকে স্বতোৎসার
যদি ধুয়ে দ্যায় বোধি
যদি অনুভবে বেজে ওঠে
ঝরে যাওয়া এইসব হিম
ভোররাতে কোজাগর চাঁদের কিরণ
যদি ভালবাসে দ্যুতি
শান্ত আমি প্লুত
নির্বাণের দিকে হেঁটে যাবো
আর
হাঁটাপথে বেজে উঠবে অজস্র নির্মাণ
আমার লাগে না
ক্লান্ত লাগে । এত কাজ । এত
যোগাযোগ ।
চব্বিশ ঘণ্টাও এত কম পড়ে যায় ।
বন্ধুরা বিরক্ত হয় । বসন ও ব্যাসন
ভুলে যাই ।
সংসারে বিবিধ অভাব জমে ওঠে ।
আর আমি আরও দূর নির্বাসনে যাওয়ার
আগে
নির্লিপ্ত সেই বইটি লেখার কথা
ভাবি ।
শুধুই শিল্পের সৌজন্যে আমি যার
নাম রেখেছি : আমার লাগে না
মুঠো
এইটুকু তো মুঠি । যতটা হাসিল
করে নিই
তার সহ্স্রগুণ
মুহূর্তের প্রয়োজন হয় ।
প্রয়োজন হলেই কি হয়
আরও কতো ভূমিকা রয়েছে ।
ভাবি আর ছোট
আরও ছোট হয়ে আসে মুঠি
যতো ছোট স্বমেহনে লাগে
সত্যি কিছু
দুম করে সত্যি কিছু বলে ফেলি
আর পরিবেশ দূষিত হয়ে যায় ।
মানুষের হজম শক্তি কমে গেছে ইদানিং
খুব সত্যি কিছু এখন সহ্য হয় না কারো ।
ভাবি কেন যে অশুদ্ধ হতে শিখিনি
নিদেন নিশ্চুপ কিংবা বীতবাক
সত্যি কিছু ঠিকঠাক বলতে নেই
তবে ফর্মুলায় ঢেলে দিলে ফুলমার্ক
না হলে চারপাশটা ফের পিসিইউ
আর কত রকমর যে আক্কেলসেলাম……
১৩ পৌষ ১৪১৭
বড়দিনে
বড়দিনের শুভেচ্ছা আসে কত
মুখ ভুলে যাওয়া কত প্রিয় রমনীর
সদ্য সুজনেরা সব মদ খেতে ডাকে ।
উদ্দাম সঙ্গীতে কারা
নেচে ওঠে উন্মাদের মতো ।
হাইওয়ে ভরে ওঠে
মদগন্ধ বোতলভাঙ্গায়......
ক্রমশঃ উৎসাহশূন্য হয়ে উঠি
প্রতিদিন । ব্রাত্য হয়ে উঠি
এবং অযোগ্য
এই প্রগলভ পৃথিবীতে
এলোমেলো
এলোমেলো
হয়ে ওঠে সবকিছু
তন্ডুল উদ্ধারে গেল সবটুকু রোখ
দিন যায়, রাতগুলি আমি পিছু পিছু
সর্বস্ব উজাড় হলে বন্ধ করি চোখ
এভাবে বয়স বাড়ে বেড়ে ওঠে ঋণ
কোথায় সুজন সব যোগাযোগ ক্ষীণ
অসুখী অক্ষরে লিখি ক্লান্ত দিনলিপি
মাংসগন্ধে মুছে যায় প্রণয়ের লিপি
হৃদয়
দেওয়ালেও রঙ ধরে
দৃশ্যমান হয় কেন না
হৃদয়ের মতো তার কোন
সংগুপ্ত কোটর নেই ।
গজু এসে দেওয়ালের
দাগ মুছে দিয়ে যায় ।
বাজারে নানান সব রঙ
এখন । চড়িয়ে দিলে
সব বিলকুল সাফ ।
হৃদয়ের জন্য কোন
রঙবাজার নেই আজো....
৩ পৌষ ১৪১৭
নাস্তি
নাস্তির জন্য বসে থাকতে নেই
তার আগেই ডুব দিতে হয়
মেঘবালিকার চুলে, যেখানে স্বপ্নের
ঘনঘটা আর সাপের ফণার মতো
কবোষ্ণ নিঃশ্বাস থম মেরে থাকে ।
নাস্তি এক আপাত অন্তরা তারও
আগে মোহময়ী অনেক রাগিণী,
গমকে গমকে কত মোহ ও মল্লার
ডুবে যেতে হয় সেই সুরসন্ধিক্ষণে,
যেন সেই শুরু, দোলাচল, লগ্ন আবাহনী…….
কবিদের সব লাগে, শুধু তারা
লুন্ঠন শেখেনি, ভালোমানুষের মতো
অন্তরার মোহে বসে থাকে আর
মেঘবালকেরা এসে তার স্বপ্ন কেড়ে
নিয়ে যায়,
তার ডোবা হয় না কখনো………..
সোনা
এক গ্রাম সোনার দাম নাকি ঢাই
হাজার এখন
ধনতেরাসের সন্ধ্যেবেলায় খবর পেলাম
।
এক গ্রাম সোনা দিয়ে কি হয়, খুদে নাকছাবি ।
মারাঠায় নাকছাবির প্রচলন খুব ।

No comments:
Post a Comment